স্বচ্ছ পানির নিচে ‘স্বর্গ’ দেখা

স্নোরকেলিং মাস্ক, ফিন পরে সবকিছু ঠিকমতো আছে কি না দেখার জন্য ক্যামেরা ছাড়াই ডুব দিলাম। প্রায় সাথে সাথে প্রায় ২০০ মাছের একটা ঝাঁকের মধ্যে পড়লাম।

প্রতি বছরই ভাবি, ডিসেম্বরের শেষের দিকে সেন্টমার্টিন যাব। কারণ বছরের এ সময়টায় সমুদ্রের পানি সবচেয়ে স্বচ্ছ থাকে। আবার ভিড়ও বেশি থাকে এ সময়। টিকেট/শিপ/হোটেল সবকিছুই পাওয়া দুষ্কর। এভাবে শেষ পর্যন্ত মার্চ চলে আসে, যখন পানি মোটামুটি ঘোলা হয়ে যায়। গত বছর রোহিঙ্গা ও সিগন্যালজনিত সমস্যার কারণে মানুষ অনেক কম যাচ্ছিল। সুযোগ বুঝে ১৭ ডিসেম্বর সেন্টমার্টিনে চলে গেলাম। সঙ্গে ট্রাভেলার্স অব বাংলাদেশের (টিওবি) আরেকজন মডারেটর তালাশ শাহনেওয়াজ।

আমার সাথে স্নোরকেলিং সেট ছিল। গত বছর আনিয়েছিলাম আমেরিকা থেকে। বাংলাদেশও পাওয়া যায় এখন। সেন্টমার্টিনের পশ্চিম সৈকতে নিরিবিলি ‘ড্রিম নাইট রিসোর্ট’-এ উঠলাম আমরা। মূল লক্ষ্য ছিল আসলে স্কুবা ডাইভিং করা। কিন্তু সেটা করতে ব্যর্থ হয়েই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে হলো। তবে আমার কাছে স্নোরকেলিংটাও বেশ ভালো লাগে। ডাইভিংয়ে কিছুটা নার্ভাস লাগে। কিন্তু স্নোরকেলিংয়ে আত্মবিশ্বাসের কোনো ঘাটতি থাকে না।

এবার সেন্টমার্টিনে কেউ স্কুবা করাচ্ছে না-এ তথ্য আমরা জানতাম না। ফলে কিছুটা হতাশই হয়েছিলাম। যাই হোক, প্রথম দিন রিসোর্টে পৌঁছে খাওয়া-দাওয়া সেরে রওনা দিলাম ছেঁড়া দ্বীপের উদ্দেশে।

স্নোরকেলিং করতে হয় ভাটার সময়। তখন ভাটা ছিল ঠিক, তবে দুপুরের পর রওনা দেওয়াতে আলো খুব কমে যাচ্ছিল। অনেক জীবিত কোরাল দেখলাম, কিছু মাছও দেখলাম। জোয়ারের পানি সরে গেলে যে কোরালগুলো শুকনো জায়গায় থাকে, সেগুলো মরে যায়। এ কারণেই জীবিত কোরাল দেখতে ভাটার সময় নামতে হয়। এ ছাড়া জোয়ারের ধাক্কায় স্নোরকেলিং করার সময় মারাত্মক আহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সেদিনের মতো আমরা ফিরে গেলাম রিসোর্টে। পরের দিন সকালে নাস্তা করে বের হওয়ার সময় দেখলাম, জোয়ার তখন আছে।

এদিকে তিনটায় আমাদের ফিরতি টিকেট। কিছু করার নেই, ভাটার অপেক্ষা না করেই এই কমে আসা জোয়ারে নামার সিদ্ধান্ত নিলাম। আগের দিন যেখানে নেমেছিলাম, সেখানে না নেমে অন্যদিকে নামলাম। স্নোরকেলিং মাস্ক, ফিন পরে সবকিছু ঠিকমতো আছে কি না দেখার জন্য ক্যামেরা ছাড়াই ডুব দিলাম। প্রায় সাথে সাথে প্রায় ২০০ মাছের একটা ঝাঁকের মধ্যে পড়লাম।

দেখতে কাঁচকি মাছের মতো, কিন্তু গায়ে তীব্র নীল ডোর দাগ দেওয়া এই মাছের পুরো ঝাঁক আমাকে দেখে থমকে গেল। দুঃখে মাথার চুল ছেড়ার অবস্থা আমার, কেন অ্যাকশন ক্যামটা সাথে নিয়ে নামলাম না।

ক্যামেরা নিয়ে অনেকক্ষণ সেই ঝাঁক খুঁজে বেড়ালাম। কিন্তু কোনো লাভ হলো না। সেখান থেকে উঠে আরেকটু সামনে আরেক জায়গায় নামলাম। এবার দুজন একই সাথে নেমেছি। একটু পরে তালাশকে দেখলাম এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক কোমর পানিতে।

আমি তাকাতেই বলল, এখানে একটা বেশ বড় মাছের ঝাঁক আছে। সাথে সাথে ডাইভ দিলাম আমি। পানির নিচে হাত দিয়ে তালাশ নির্দেশনা দিচ্ছিল কোথায় যেতে হবে। ওকে অতিক্রম করতেই দেখা পেলাম পুরো দলটার। এ যেন পানির নিচের বিশাল অ্যাকুয়ারিয়াম। মূলত হলুদ ও কালো ডোরাকাটা অ্যাঞ্জেল ফিশের ঝাঁক এটা। বেশ বড়সড় কয়েকটাকেও দেখলাম দলের সাথে।

দেখলাম কয়েক প্রকারের সামুদ্রিক কই। কালো রঙের এই কইগুলোর ভালোই সাহস আছে। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে, কাছে গেলেই ঝট করে ঢুকে পড়ে কোনো কোরালের ফাঁকে। পিছু নিয়ে আর কোনো লাভ হয় না, কোরালগুলোর কোনো না কোনো খাঁজ দিয়ে আবার বেরিয়ে অন্য পাশে চলে যায়।

অনেকক্ষণ ধরেই মাছগুলোকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিলাম। এর মধ্যে তালাশও যোগ দিয়েছে আমার সাথে। দুজন মিলে আরও কিছুক্ষণ মাছ দেখে উঠে পড়লাম।

উপরে উঠতেই তালাশের প্রথম প্রশ্ন, আপনি এ রকম বাইন মাছের মতো মোচড়া-মোচড়ি করছিলেন কেন? উত্তর দিলাম, মাছ যেদিকে যাচ্ছিল, আমিও ফিনের সাহায্য নিয়ে দ্রুত তাদের পেছনে যাচ্ছিলাম। এক জায়গা থেকে উঠে আরেক জায়গায় চেষ্টা করেছিলাম কিছুক্ষণ। কিন্তু তেমন কোনো মাছ পাচ্ছিলাম না।

একটু পরে আবিষ্কার করলাম, জাল পাতা আছে ওখানে। এদিকে দুপুর ১২টার বেশি বাজে, পরিপূর্ণ ভাটা এখন। কিন্তু হায়, আমাদের হাতে আর সময় নেই, দ্রুত ফিরে চললাম রুমের দিকে। তিনটায় শিপ ছেড়ে যাবে, তার আগেই আমাদেরকে গোসল করে ভাত খেয়ে ফিরতে হবে জেটিতে।